জানেন কী? পৃথিবীর প্রতি সাতজনের একজন ঘুমাতে যান ক্ষুধার্ত পেটে - Aaj Bikel
জানেন কী? পৃথিবীর প্রতি সাতজনের একজন ঘুমাতে যান ক্ষুধার্ত পেটে

জানেন কী? পৃথিবীর প্রতি সাতজনের একজন ঘুমাতে যান ক্ষুধার্ত পেটে

Share This

১৬ অক্টোবর৷ বিশ্ব খাদ্য দিসব। ১৯৭৯ সালে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন) ২০তম সাধারণ সভায় হাঙ্গেরির তৎকালীন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. প্যাল রোমানি বিশ্বব্যাপী এই দিনটি উদযাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৮১ সাল থেকে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিষ্ঠার দিনটিতে (১৬ অক্টোবর, ১৯৪৫) দারিদ্র ও ক্ষুধা নিবৃত্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে এই দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে৷

মূল ভাবনার নেপথ্যে থাকা রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয় সংগঠনের (Food & Agriculture Organization) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে ফি বছর অপচয় হওয়া খাদ্যের পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন টন, যা কি না সাহারা নিম্নবর্তী সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে উৎপাদিত খাদ্যের সমান। একদল অতিভোজী মানুষ যখন ফেলে ছড়িয়ে নষ্ট করছে টন টন খাদ্য তখন, কি আশ্চর্য পৃথিবীর প্রতি সাতজনের একজন ঘুমাতে যায় ক্ষুধার্ত পেটে, প্রতি বছর পাঁচ বছরের কমবয়সী বিশ হাজার শিশু জঠরের বহ্নিজ্বালা সহ্য করতে না পেরে বিকশিত হওয়ার আগেই মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয় এই পৃথিবীর; প্রতি দশজন মহিলার মধ্যে সাতজনই ভোগেন অপুষ্টিজনিত রক্তাল্পতায়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রাক্তন মহাসচিব বান্‌-কি-মুনের কথায়, ‘আমরা বেঁচে আছি এমন এক প্রাচুর্যময় দুনিয়ায় যেখানে খাদ্য উৎপাদন চাহিদাকে ছাপিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ৮৭ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে, শৈশবের বৃদ্ধিহীনতা যেখানে নীরবে সর্বব্যাপী রোগের চেহারা নিয়েছে। আমাদের কাঙ্ক্ষিত পৃথিবী গড়ে তুলতে হলে এই অসাম্য দূর করতেই হবে। ২০১২ সালে তৃতীয় রিও মহাসম্মেলনে গৃহীত স্থিতিশীল উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এক ক্ষুধাহীন বিশ্ব গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ (‘zero-hunger challenge’) গ্রহণ করতেই হবে আমাদের।’ আর সে কারণেই এবারের স্লোগান — ‘রোধ কর খাদ্য অপচয়’। ধনী দেশগুলিতে দেদার অপচয় শিল্পোন্নত প্রথম বিশ্বের নাগরিকরা খাদ্য অপচয়ে সবার থেকে এগিয়ে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডে মানুষ খাদ্য হিসাবে যা কেনে তার এক-তৃতীয়াংশই অপচয় করে৷

মার্কিন মুলুকে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হয় তার ২০-৪০ শতাংশই নষ্ট হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয় বাড়িতে কেনা হয় এমন খাবার-দাবার, মোট নষ্ট হওয়া খাদ্যের প্রায় ৪৪ শতাংশ। প্রতিদিন মুদির দোকানে যা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বিক্রি না হওয়া মজুত খাদ্যের ফেলে দেওয়া অংশের পরিমাণ মোট অপচয় হওয়া খাদ্যের ১১ শতাংশ। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, অফিস, কাছারির মতো প্রতিষ্ঠানগুলির ক্যান্টিন থেকে রোজ ফেলে দেওয়া হয় ‍‌মোট অপচয় হওয়া খাদ্যের ১০ শতাংশ। বিভিন্ন বড় রেস্তোরাঁ থেকে ফেলা হয় ২০ শতাংশ। সে দেশের পৌর আবর্জনার সব থেকে বড় অংশটাই (২১ শতাংশ) হলো ফেলে দেওয়া বা নষ্ট হওয়া খাবার-দাবার। আমেরিকার নষ্ট হওয়া খাদ্যের মূল্যমান বছরে ৪৮.৩ বিলিয়ন ডলার। ২০০৮ সালের মে মাসে বিবিসি-কৃত এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ইংল্যান্ডে প্রতিদিন গড়ে ৫৫০০টি ছাড়ানো গোটা মুরগি ফেলে দেওয়া হয়। আর প্রতিদিন ফেলে দেওয়া ঢাকনা না খোলা ইয়োগার্টের ভাঁড়ের সংখ্যা ১৩ লক্ষ। কেভিন হল ও তাঁর সহকর্মীরা বছর কয়েক আগে দেখিয়েছেন মার্কিনমুলুকে খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ ১৯৭৪ সালের নিরিখে বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০ শতাংশ। শক্তির হিসাবে ১৯৭৪-এ যেখানে জনপ্রতি দৈনিক অপচয়ের পরিমাণ ছিল ৯০০ ক্যালোরি, ২০০৯-এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪০০ ক্যালোরি। তার মানে সারা বছর খাদ্য অপচয়ের মধ্যে দিয়ে নষ্ট হচ্ছে ১৫০ ট্রিলিয়ন ক্যালোরি (১৫-র পিঠে ১৩টা শূন্য) ; যা কি না ৩০০ মিলিয়ন ব্যারেল খনিজ তেলের শক্তির সমান। এই বিপুল পরিমাণ অপচয় হওয়া খাদ্যের মাত্র ৫ শতাংশ দিয়ে ৪০ লক্ষ মানুষের একদিনের আহারের সংস্থান হতে পারত। সারা বছর মার্কিনীরা যে পরিমাণ খাদ্য অপচয় করে তা দিয়ে ২০০ কোটি মানুষকে সারা বছর ধরে দিব্যি পেট পুরে খাওয়ানো সম্ভব হতো। খাদ্য অপচয়ের অন্য চেহারা উন্নয়নশীল তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলিতেও যে খাদ্য অপচয় হচ্ছে না এমনটা নয়। তবে, সে অপচয় উৎপাদন প্রক্রিয়ার একেবারে প্রাথমিক স্তরেই বেশি। খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও সঞ্চয়ের আধুনিকতর উন্নত প্রযুক্তির অভাবই মূলত তৃতীয় দুনিয়ার খাদ্য অপচয়ের প্রধান কারণ৷

ভারতের কথাই যদি ধরি পর্যাপ্ত গুদামের অভাবে ফি বছর সংগৃহীত দানাশস্যের ৬ ভাগের ১ ভাগ ফেলে রাখতে হয় খোলা আকাশের নিচে। এন ডি টিভি-র একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী শুধু এ কারণেই বছরে নষ্ট হয় ২০-৩০ শতাংশ ফসল। গত বছর বর্ষার প্রথম মাসেই নষ্ট হয়েছিল ১১৭০০ টন মজুত খাদ্যশস্য। অথচ একটু উদ্যোগী হলে এই টন টন খাদ্যশস্যকে খোলা আকাশের নিচে নি‍শ্চিত পচনের জন্য ফেলে না রেখে নিরন্ন ভারতবাসীর মুখে খাদ্য তুলে দেওয়া যেতে পারত অতি সহজেই৷

এ বিষয়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও সরকারের তেমন সদিচ্ছা দেখছি না আমরা। বরং গরিব ক্ষুধার্ত মানুষকে এ পি এল, বি পি এল-এ বিভাজিত করে, কে জানে কার গোপন নির্দেশে খাদ্য গণবণ্টন ব্যবস্থাটাকেই ধ্বংস করার দিকে যেন বেশি আগ্রহ সরকারের। অনন্ত অপচয়ের বিপ্রতীপে এই অনন্ত অপচয়ের বিপ্রতীপে আছে এক বুভুক্ষু বিশ্ব। উন্নয়নশীল তৃতীয় দুনিয়ার দেশে দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সারি ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বজুড়ে বুভুক্ষু মানুষের মৃত্যু মিছিল অব্যাহত। আমাদের প্রিয় স্বদেশভূমিও এর ব্যতিক্রম নয়। এ দেশে অর্ধেক শিশু ভুগছে অপুষ্টিতে, এক-তৃতীয়াংশ মানুষের দেহ-ভর সূচক (body-mass index) স্বাভাবিকের থেকে কম ; ৭০ শতাংশ মহিলা রক্তাল্পতার শিকার। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার নথি অনুযায়ী এ দেশে দৈনিক ন্যূনতম ২৪০০ ক্যালোরির কম খাদ্য গ্রহণকারী গ্রামীণ মানুষের সংখ্যা যেখানে ১৯৯৩-৯৪ সালে ছিল ৭৪.৫ শতাংশ, সেখানে ২০০৪-০৫-এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ শতাংশ। খাদ্য অপচয়ের পরিবেশগত প্রভাব সারা বিশ্বে মোট যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হয় তার জন্য লাগে ২৫ শতাংশ বাসযোগ্য জমি। আমরা যে পরিমাণ জল ব্যবহার করে থাকি তার ৭০ শতাংশই লাগে খাদ্য উৎপাদন করতে। যে পরিমাণ অরণ্য ধ্বংস হয় তার ৮০ শতাংশই খাদ্য উৎপাদনের কারণে। খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নির্গত হয় বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিন-হাউস গ্যাসের ৩০ শতাংশ৷

জীব-বৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম বড় কারণ হিসাবেও দায়ী করা যায় ধারাবাহিকভাবে বিশেষ কয়েকটি ফসলের চাষকে। এহেন খাদ্যের অপচয়ের যে প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে পরিবেশের ওপর সে আর বেশি কথা কি? উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে ১ লিটার গোরুর দুধের অপচয় মানে কেবল দুধটুকুর অপচয় তা কিন্তু নয়। ১ লিটার দুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন ১০০০ লিটার জল। ফলে ১ লিটার দুধের অপচয় মানে ১০০০ লিটার জলের অপচয়। একইভাবে ১ কিলোগ্রাম মাংস নষ্ট করা মানে ১৬০০০ লিটার জল নষ্ট করা। এছাড়া ওই দুধ বা মাংসটুকু প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বোতলজাত বা প্যাকেটজাত করা, সেগুলি রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা, ট্রেনে বা ট্রাকে দূরবর্তী স্থানে নিয়ে আসা এবং বাজারজাত করা — এ সবের মধ্যে নিয়ে খরচ হয় বিপুল পরিমাণ শক্তি এবং নির্গত হয় প্রভূত পরিমাণ গ্রিন-হাউস গ্যাস। এছাড়া মাটিতে ফেলে দেওয়া নানা খাদ্যসামগ্রী পচন ও শঠনের ফলে প্রচুর পরিমাণ তৈরি করে মিথেন ও অন্যান্য গ্রিন-হাউস গ্যাস। ইংল্যান্ডবাসীরা যে পরিমাণ খাদ্য প্রতিদিন অপচয় করে থাকে তা বন্ধ করতে পারলে ১৭০ লক্ষ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমন রোধ করা সম্ভব, যে পরিমাণটা কিনা প্রতি ৫টি মোটরগাড়ির ১টি রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া গেলে গ্রিন-হাউস গ্যাস নির্গমন যতটা কমতে পারে তার সমতুল্য। অপচয়ের দায়ভার একদিকে অপুষ্টিক্লিষ্ট ক্ষুধাতুর নিরন্ন মানুষের হাহাকার অন্যদিকে খাদ্যের অশ্লীল অপচয়। পৃথিবীর সামগ্রিক নষ্ট হওয়া খাদ্যের পরিমাণ মোট উৎপাদিত দানাশস্যের অর্ধেকেরও বেশি৷

কিন্তু এই বিপুল অপচয়ের দায় কার? সে কি ব্যক্তি মানুষের দুর্নিবার ভোগস্পৃহা? অনন্ত লোভ? নাকি ক্রমবর্ধমান জনভার? আসল দোষীকে আড়াল করে সব দায়টুকু জনবিস্ফোরণের বস্তাপচা ম্যালথুসীয় তত্ত্বের প্রযত্নে বা ব্যক্তি-মানুষের ভোগাকাঙ্ক্ষার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রবল প্রয়াস সব সময় চলছেই। তাহলে দায়ী কে? সারা কারসন তাঁর সদ্য প্রকাশিত (মে, ২০১৩) ‘ফুড অ্যান্ড ক্যাপিটালিজম: এ ক্রাইসিস অব ওয়েস্ট অ্যান্ড ডেসট্রাকশন’ গ্রন্থে লিখছেন, পুঁজিবাদ ও সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের সেবায় নিয়োজিত দ্রুতগতিতে বিকাশমান প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এহেন অপচয় ও ধ্বংসজনিত অতি সঙ্কট (Super-crisis of waste & destruction)।’ বিশ্ব পুঁজিবাদের গর্ভে জন্ম নিয়েছে ধ্বংসকামী চরম ভোগলিপ্সা। পুঁজিবাদ আজ বিশ্বজুড়ে ঠিক করে দিচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস। তাই ম্যাক ডোনাল্ডের মতো কোম্পানি অক্লেশে কেবল বিজ্ঞাপনের পিছনে বছরে ১৭০০ কোটি ডলার খরচ করে থাকে শুধুমাত্র শিশুদেরকে তাদের ব্র্যান্ডের প্রতি আকৃষ্ট করতে। নিজস্ব ব্র্যান্ডের খাবারের বাজার ধরতে খাদ্য উৎপাদনকারী বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলি হামেশাই স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী নামকরণ করে সেইসব খাদ্যের। যেমন ভারতে ম্যাকডোনাল্ডের মুরগির মাংস বিক্রি হয় ‘মহারাজা ম্যাক’ নামে; আবার সেই একই মাংস একটু অন্যরকম প্রণালীতে প্রস্তুত করে স্পেনীয় খাদ্য বারিটোসের নামে বিক্রি করা হয় স্পেনের বাজারে। বহুজাতিক পণ্যের এহেন স্থানীয় লেবেল সেঁটে আঞ্চলিক বাজার দখলের এই কৌশলকেই পল হারবিগের মতো অর্থনীতিবিদরা বলেছেন ‘গ্লোবালাইজেশন’। আবিশ্ব এভাবেই তৈরি হয় অস্বাস্থ্যকর অতি-ক্যা‍‌লোরিসর্বস্ব জাঙ্ক-ফুড সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন অপচয়মুখী ভোগলিপ্সু একটা গোটা প্রজন্ম। এভাবেই দেশজ খাদ্য সংস্কৃতি নিশ্চিত ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায়; ধ্বংস হয় জীব-বৈচিত্র্য — যেভাবে একদিন হারিয়ে গেছে এই বাংলার উড়কি ধানের মুড়কি অথবা বিন্নি ধানের খই। খাদ্য অপচয়ের নেপথ্য কাহিনী পুঁজিবাদী কৃষি ব্যবস্থায় ফসলের বাজারি মূল্য পড়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় প্রায়শই উৎপাদিত ফসলের একটা বড় অংশ জমিতেই ফেলে রাখা হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ইংল্যান্ডে দাম ধরে রাখতে উৎপাদিত সবজির ৩০ শতাংশ কখনোই জমি থেকে তোলা হয় না৷

স্থানীয় জীব-বৈচিত্র্য ধ্বংস করার ক্ষেত্রেও পুঁজিবাদী কৃষির একটা বড় ভূমিকা থেকে যায়। গত শতাব্দীর ৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ৯০-এর দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত মাত্র ১৪ বছরের ব্যবধানে উদার অর্থনীতির হাত ধরে হাইতির মতো হতদরিদ্র একটি দেশের দেশজ প্রজাতির ধান উৎপাদন যেভাবে ধ্বংস হয়েছে তা এককথায় পুঁজিবাদী কৃষি কিভাবে কোনো একটি দেশের জীব-বৈচিত্র্য ধ্বংস করে থাকে তার এক অনন্য উদাহরণ। কেননা ওই সময়কালে হাইতির নিজস্ব ধান উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৪০ শতাংশ, যেখানে ওই একই সময়কালে মার্কিনমুলুক থেকে সে দেশে আমদানি করা ধানের পরিমাণ ৪ শতাংশ থেকে বাড়তে বাড়তে ৬৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তথ্য বলছে আমেরিকা এইভাবে অন্য দেশের খাদ্যপণ্যের বাজার দখল করার উদ্দেশ্যে ফি বছর ২০০০ কোটি ডলার খরচ করে চলেছে খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারী কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে ভরতুকি দিতে৷

১৯ মে, ২০১৩ সালে  প্রকাশিত এক সংবাদ অনুযায়ী ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ‘প্ল্যান্ট রিপ্রোডাকশন মেটেরিয়াল ল’ নামে একটি আইন পাস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। যে আইনের বলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে বিভিন্ন ফসলের প্রজননকারী ও বিভিন্ন বীজ সংগ্রহকারী ও রক্ষাকারী ব্যক্তি ও সংগঠনসমূহ। বীজ-সার্বভৌমত্বের (seed-sovereignty) ওপর যে এক নগ্ন আক্রমণ যার ফলে নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জীব-বৈচিত্র্য। অন্যদিকে, আরো একভাবে উন্নত পুঁজিবাদী দুনিয়ার চূড়ান্ত ভোগলিপ্সার মূল্য চোকাতে হচ্ছে বিশ্বকে। আফ্রিকাসহ বহু উন্নয়নশীল দেশে গরিব মানুষের অন্যতম খাদ্য ভুট্টা। অথচ মার্কিনমুলুকে উৎপাদিত ভুট্টার ৪০ শতাংশই ব্যবহৃত হচ্ছে ইথানল প্রস্তুতি যা কিনা সে দেশের মানুষের গাড়ি চেপে ঘুরে বেড়ানোর সাধ মেটাতে পেট্রোলিয়ামের বিকল্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এইভাবে বিশ্বের মোট উৎপাদিত ভুট্টার ৬ ভাগের ১ ভাগই খরচ হয়ে চলেছে আমেরিকার পথে পথে ঘুরে বেড়ানো মোটরগাড়ির জ্বালানি হিসাবে। গত ৩৩ বছরে মার্কিন সরকার তেল উৎপাদক সংস্থাগুলিকে মোট ২০০০ কোটি ডলার খয়রাতি দিয়েছে খনিজ তেলের বিকল্প হিসাবে ভুট্টা থেকে তৈরি ইথানল ব্যবহারে প্রণোদিত করতে। বুভুক্ষু মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে চালান করা হচ্ছে গাড়ির পেটে। শুধু তাই নয়, ভুট্টা অনেক পশুরও খাদ্য। ফলে ভুট্টার এই কৃত্রিম সঙ্কটের কারণে সারা বিশ্বে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে মাংস, ডিম বা দুধের দাম। এরই নাম নাকি পরিবেশ প্রেম! এটাই নাই পরিবেশ-বন্ধু উন্নয়নের সবুজ পথ! অথচ ওই প্রচুর পরিমাণ ভুট্টা উৎপাদনের জন্য যে বিপুল পরিমাণ জল, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয়, হিমঘরে ওই ভুট্টা সংরক্ষণের জন্য এবং ভুট্টা থেকে ইথানল প্রস্তুতির জন্য যে প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভুট্টার পরিবহনের জন্য যে প্রভূত পরিমাণ খনিজ তেল পোড়ে — পরিবেশের ওপর তার বিষময় ফলের হিসাব কে রাখে৷

অপচয়হীন, ক্ষুধাশূন্য পৃথিবী গড়ার শপথ এ কথা ঠিকই খাদ্য অপচয় রোধ করা পুরোপুরি আমাদের ওপর নির্ভর করে না। কারণ অপচয় রোধে সব থেকে আগে যেটা দরকার তা হ’ল উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের উৎস কমানো। যে বিষয়টা আদপেই আমাদের হাতে নেই। তবু কিছু কিছু অভ্যাস গড়ে তো তোলাই যায়। আমরা যদি স্থানীয় বাজার থেকে মরসুমি সবজি ও ফল কিনতে পারি, আমরা যদি রাসায়নিক বর্জিত খাদ্য কেনার ব্যাপারে উদ্যোগী হতে পা‍‌রি, আমরা যদি বহুদূর থেকে খনিজ তেল পুড়িয়ে আমদানি করা ফসলের চেয়ে দেশজ ফসলের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারি, যদি যত দূর সম্ভব জাঙ্ক-ফুডের মোহ এড়িয়ে চলতে পারি, যদি স্থানীয় খাদ্য ও খাদ্য সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে পারি এবং সর্বোপরি বাজারের হাতছানি উপেক্ষা করে যদি প্রয়োজনের থেকে বেশি খাদ্যপণ্য না কেনার শপথ নিতে পারি তাহলে খাদ্য অপচয় রোধে ব্যক্তিগত বা পরিবারগত স্তরে আমাদের সীমিত দায়িত্বটুকু হয়তো পালন করতে পারি আমরা৷

কিন্তু শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয়। যে ভোগসর্বস্ব মুনাফালিপ্সু পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রকৃতি ও পরিবেশের এমন সীমাহীন ধ্বংস ও অশ্লীল অপচয়ের জন্য দায়ী সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যদি জেহাদ ঘোষণা না করতে পারি আমরা তবে খাদ্য অপচয় রোধের স্লোগান ব্যর্থ হতে বাধ্য। আসুন জোট বাঁধি এমন একটা পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে যেখানে খাদ্য উৎপাদনের প্রধানতম লক্ষ্য হবে মুনাফা অর্জন নয়, আপামর মানুষের ক্ষুণ্ণিবৃত্তি ও পুষ্টিবিধান, যে পৃথিবীতে একটি শিশুও অপুষ্টিতে ভুগবে না, একজন মানুষও জঠরের বহ্নিজ্বালা নিয়ে যাপন করবে না নিদ্রাহীন যন্ত্রণাকাতর রাত্রি৷

কোন মন্তব্য নেই: