বৃহস্পতিতেই মোদী সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ৷ ২০১৯ সালের মাঝামাঝি যেহেতু পরবর্তী লোকসভার নির্বাচন। তাই তার আগে পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করা যাবে না। স্বাভাবিকভাবেই এই বাজেটকেই যথাসম্ভব নির্বাচনী বাজেট বা ভোট বাজেট করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে বলে মত অর্থনীতিবিদদের একাংশের৷ কিন্তু কাজটা যে মোটেই সহজসাধ্য নয় তা মোদী-জেটলিরা জানেন৷ কোনও প্রাক নির্বাচনী বাজেট মানে পরবর্তীকালের জন্য প্রতিশ্রুতির বন্যা নয়৷ তাতে বিগত সময়কালের সরকারের সাফল্যের খতিয়ানও তুলে ধরতে হয়৷
কারণ মানুষ তো জানতে চাইবেন গত নির্বাচনে যা যা বলে মানুষের সমর্থন আদায় করা হয়েছিল সেই কাজ কতটা হয়েছে৷ এই জায়গাতেই একটা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। ভোটের আগে যা বলা হয়েছিল সরকার সে কাজ করেছে এমন নজির থাকলে সেই সরকারের ওপর মানুষের পুনরাস্থা তৈরি হয় সহজেই। একমাত্র তখনই তাদের দেওয়া নতুন প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। মোদী সরকারকে আগামী লোকসভা নির্বাচনে মানুষের মুখোমুখি দাঁড়াতে হলে সর্বাগ্রে পুরানো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজের হিসাব পেশ করতে হবে। নচেত নতুন প্রতিশ্রুতি নতুন ধাপ্পা হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে যাবে।
বাজেট যেহেতু নির্বাচনী ইশ্তেহার নয় এবং ভোটেরও যেহেতু এখনও প্রায় দেড়বছর বাকি তাই তাতে সরাসরি নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সুযোগ কম। বদলে গত সাড়ে তিন বছরের সাফল্য তুলে ধরে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের সুযোগ বেশি। কিন্তু মোদী সরকারের সাফল্যের ভাঁড়ার যেহেতু খালি তাই সাফল্যের ইতিবাচক ভিতে দাঁড়িয়ে নতুন করে জয়ের স্বপ্ন দেখা কঠিন। তাই সত্যকে আড়াল করে, ব্যর্থতার বোঝা চাপা দিয়ে নতুন ধোঁকাবাজির আবহ সৃষ্টি করতে হবে জেটলিকে।
এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির হাল মোটেই ভালো নয়। বৃদ্ধির হার শুধু তলানিতে নয়, গত তিরিশ বছরের গড় বৃদ্ধির হার থেকেও নিচে নেমে গিয়েছে। ফলে এতদিন ধরে বিকাশের যত গল্প শোনানো হয়েছে তার সবই মিথ্যার বেসাতি। বলা হয়েছিল বছরে দুকোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টির তথ্য এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং বারবার সামনে আসছে কাজ হারানোর এবং মজুরি হ্রাসের তথ্য। শেষ পর্যন্ত পিঠ বাঁচাতে মোদীকে বলতে হয় পকোড়া বিক্রি করে দিনে ২০০ টাকা রোজগার করলে সেটাও চাকরিরই মতো। অর্থাৎ কাজ না পেয়ে বেকার মানুষ পেটের দায়ে যে কোনও উপায়ে কিছু রোজগারের চেষ্টা করলে মোদী সেটাকে তাঁর সরকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সাফল্য হিসাবে তুলে ধরার ভণ্ডামি করছেন। মেক ইন ইন্ডিয়া প্রকল্পের ঢাক পিটিয়ে বলেছিলেন এখন থেকে সারা বিশ্বে ‘মেড ইন ইন্ডিয়াত’ পণ্য ছড়িয়ে পড়বে। সব বিদেশি সংস্থা ভারতে পণ্য উৎপাদনে ঢেলে বিনিয়োগ করবে। তেমন কিছুই হয়নি। যেটুকু বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে তা মূলত ভারতীয় কোম্পানির মালিকানা ক্রয়ের জন্য। নতুন শিল্পে বিনিয়োগ শূন্য। তেমনি কালো টাকা বিদেশ থেকে ভারতীয়দের সকলকে ১৫ লক্ষ টাকা করে দেবার গল্পটিও লোক ঠকানোর পর্যায়ে চলে গিয়েছে।
সাড়ে তিন বছরের সত্য এটাই যে মোদী ভোটের আগে দেওয়া কোনও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। পরে সরকার চমক আর নাটকের মাধ্যমে নানা ধরনের প্রকল্প ঘোষণা করে প্রচারের ঝড় তুলে মোদীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেছে তা জনগণের কোনও লাভ হয়নি। জিনিসের দাম কমেনি। বিশ্বের বাজারে তেলের দাম কমলেও দেশে বেড়েছে। কৃষক ফসলের দাম পাননি। উলটে নোটবন্দি এবং জি এস টি-র ধাক্কায় আরও সর্বনাশ হয়েছে। সবচেয়ে মার খেয়েছে ছোট-মাঝারি শিল্প এবং কৃষি। অর্থাৎ যেখানে ৯০ শতাংশের কর্মসংস্থান তাদেরই জীবনযন্ত্রণা সর্বাধিক বেড়েছে। অন্যদিকে বিত্তবানদের বিত্ত বেড়েছে অনেক বেশি হারে। শতকোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। মোট জাতীয় উৎপাদনের ৭৩ শতাংশই ভোগ করছে ১ শতাংশ বিত্তবান। এই অবস্থায় সাফল্য দেখানোর কোনও সুযোগ নেই। একটাই রাস্তা, ‘জনমুখী’ বাজেটের নামে নানা প্রকল্প ঘোষণা করে প্রচারের ঝড় তুলে মানুষকে ফের বোকা বানানোর চেষ্টা করা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন