নন্দকুমার : সুরজিৎ ঘড়া। এই নামটা অনেকেই হয়তো শোনেন নি| শোনার কথাও নয়। এমনিতেই সে চোখে দেখতে পায় না। তার উপরে কোনওদিন প্রচারের আলোটুকুও পায়নি। জন্মান্ধ বললেই চলে। জীবনের এত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেও, আজ সুরজিৎ সাফল্যের যে শৃঙ্গ অর্জন করেছে; তাতে খুশি গোটা নন্দকুমার এলাকা। উচ্ছ্বাসে ভাসছে গোটা দেশ। সোমবার ব্লাইন্ড ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে পাকিস্তানকে পরাস্ত করেছে ভারতীয় ক্রিকেট দল। এই বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হলেন নন্দকুমারের ছেলে সুরজিৎ ঘড়া।
স্থানীয় সূত্রের খবর, পরিবারে আর্থিক সমস্যা থাকার কারণে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। হলদিয়ার বিবেকানন্দ মিশন আশ্রমে বড় হয়ে ওঠে সুরজিৎ। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটোবেলা থেকে খেলাধুলোর প্রতি আগ্রহ ছিল সুরজিতের। ছোটোবেলায় চোখে সামান্য দৃষ্টিশক্তি অবশিষ্ট ছিল। তা নিয়েই পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলে বেড়াত।
নন্দকুমার থানার কাঞ্চনপুরের বাসিন্দা। বাবা নিতাইচাঁদ ও মা কৃষ্ণার অভাবের সংসার। তিন ভাই। তার মধ্যে সবচেয়ে ছোট সুরজিৎ। অন্যের বাড়িতে কাজ করে দু’টো পয়সা রোজগার করে বাবা ও মা। দু’বেলা ভাত জোগাড় করাও বেশ কঠিন পরিবারে। তিন ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে হিমসিম খান বাবা-মা। অবশেষে সুখবর এল গত ৭ জানুয়ারি|। দুবাইতে শুরু হচ্ছে দৃষ্টিহীন ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ। ফাইনাল ২১ জানুয়ারি। বিশ্বকাপে অংশ নেবে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্লাইন্ড (সিএবিআই) ১৭ জনের টিম ঘোষণা করল। সুযোগ পেল পূর্ব মেদিনীপুরের সুরজিৎ। নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু। সেদিনই জাতীয় স্তরে দেশের নাম উজ্জ্বল করার শপথ নিয়েছিল সুরজিৎ।
ভারত বিশ্বকাপ জয় করেছে। হারিয়েছে পাকিস্তানকে। জয়ের প্রথম খবর আসে সুরজিতের বোন শুভেচ্ছা ঘড়ার মোবাইলে। তিনি বলেন, “সুরজিত অনেক কষ্ট করে জাতীয় ব্লাইন্ড ক্রিকেট দলে জায়গা পেয়েছে। ভাই আমার মোবাইলে প্রথম জয়ের খবর জানায়। আর সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই উল্লাসে মেতে উঠেছে গোটা এলাকা। এখন আমরা শুধুমাত্র সুরজিতের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছি। বাড়ি ফিরলে বিশাল সংবর্ধনার ব্যবস্থার কথাও ভাবা হচ্ছে। শুধু সুরজিতের বাড়ি ফেরার পথ চেয়ে রয়েছি আমরা।”
হলদিয়ার চৈতন্যপুর বিবেকানন্দ মিশন আশ্রমে পড়াশোনা করতেন। সেখানেই চোখের চিকিৎসা শুরু হয়। ক্রিকেটও শুরু সেখান থেকে। পরিবারে অনটন। কিন্তু ক্রিকেট ছিল নেশার মতো। দারিদ্র্যকে দূরে সরিয়ে ক্রিকেট অনুশীলন শুরু করেন সুরজিৎ। যেখানে ম্যাচ হত, পৌঁছে যেত। মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একদিন ঠিক পারবে। ক্রিকেটার হবে। অবশেষে স্বপ্নপূরণ। দৃষ্টিহীন ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপে সুযোগ পেল সুরজিৎ। স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক সুমিত বাগও তাঁর সাফল্যে বেশ খুশি। তিনি বলেছেন, “প্রি-প্রাইমারি থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছে সুরজিৎ। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত এখানেই ছিল। ছোট থেকে ক্রিকেটের ঝোঁক ছিল। ওকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় স্কুল থেকে।” জাতীয় স্তরে সুযোগ পেয়েছে। তাই খুশি বিবেকানন্দ মিশনও।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন