সরস্বতী কি বৈদিক দেবী? বেদে সরস্বতী সম্পর্কে কী বলা হয়েছে? - Aaj Bikel
সরস্বতী কি বৈদিক দেবী? বেদে সরস্বতী সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?

সরস্বতী কি বৈদিক দেবী? বেদে সরস্বতী সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?

Share This
 
সরস্বতী বিদ্যা, জ্ঞান, শিল্প, কলা ও সংগীতের দেবী। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায় অধ্যায়নরত বিদ্যার্থীরা এই পুজো সাড়ম্বরে করে থাকেন। মাতা সরস্বতী জ্ঞানদায়িনী অর্থাৎ কল্যাণ ও শান্তি বিধায়িনী, তিনি বরদা এবং জাগতিক মোহ ধ্বংসকারী। সুপ্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে বিশেষত বেদে সরস্বতীকে পাওয়া যায়৷ সরস্বতী তাই পুরোপুরি বৈদিক দেবী। বৈদিক ঋষিরা বিভিন্ন ধ্যান মন্ত্রে তার বন্দনা করেছেন। যেমন-

চোদয়িত্রী সূনৃতানাং চেতন্তী সুমতীনাং।
যজ্ঞং দধে সরস্বতী॥ (ঋগ্বেদ ১/৩/১১)
মহো অর্নঃ সরস্বতী প্রচেতয়তি কেতুনা।
ধিয়ো বিশ্বা বিরাজতি॥ (ঋগ্বেদ ১/৩/১২)

অনুবাদঃ
সত্য ও প্রিয়বাণীর (মঙ্গলজনক বা মানব হিতকর কথা) প্রেরণাদাত্রী এবং সৎবুদ্ধির চেতনাদাত্রী দেবী সরস্বতী শুভকর্মকে ধারণ করে আছেন। জ্ঞানদাত্রী মাতা সরস্বতী প্রজ্ঞাশক্তি দ্বারা মহান জ্ঞান সমুদ্রকে প্রকাশ করেন ও ধারণাবতী বুদ্ধি সমূহকে দীপ্তি দান করেন।

শংনো দেবা বিশ্বদেবা ভবন্তু শং সরস্বতী সহধীভিরস্তু।(ঋগ্বেদ ৭/৩৫/১১) অনুবাদ: জ্ঞান জ্যোতির রক্ষক বিদ্বানেরা আমাদের কল্যাণ বিধান করুন। বিদ্যাদেবী সরস্বতী নানা প্রকারে বুদ্ধির সাথে কল্যাণদায়িনী হোক। বৈদিক যুগে মাতা সরস্বতী বিভিন্নভাবে পূজিত হয়ে থাকলেও তাকে ঋষিরা প্রধানত দুইটি রূপে বন্দনা করে থাকতেন। (১) নদীরূপে (২) মাতৃ বা দেবী রূপে।

এই বিষয়ে বৈদিক মন্ত্র কী বলছে দেখুন-
অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী।
অপ্রশস্তা ইব স্মাসি প্রশস্তিমল্ব নস্কৃধি॥ (ঋগ্বেদ ২/৪১/১৬)

অনুবাদ: মাতৃগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নদীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, দেবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হে সরস্বতী! আমরা অসমৃদ্ধের ন্যায় রয়েছি, আমাদের সমৃদ্ধশালী কর। এই মন্ত্রে আমরা দেখতে পেলাম তিনি যেমন মাতৃগণের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ তেমনি নদীর মধ্যেও। এই সরস্বতী এক বিশাল নদী ছিল বৈদিক যুগে, যদিও বর্তমানে সেটা লুপ্ত। কিন্তু ঋষিদের বর্ণনায় আমরা সেই নদী সম্পর্কে বর্ণনা পাই।

যেমনঃ
প্র ক্ষোদসা ধায়সা সস্র এষা সরস্বতী ধরুণামায়সী পূঃ।
প্রবাবধানা রক্ষেব যাতি বিশ্ব অপো মহিনা সিন্ধুরন্যাঃ॥
একচেতৎ সরস্বতী নদীনাং শুচির্যতী গিরিভ্য আসমুদ্রাৎ। (ঋগ্বেদ ৭/৯৫/১-২)

অনুবাদ: এ সরস্বতী আয়োনির্মিত পুরীর ন্যায় ধারয়িত্রী হয়ে ধারক উদক (জল) সাথে প্রবাহিতা হচ্ছেন। তিনি অন্য সমস্ত স্যন্দনশীল জলকে মহিমাদ্বারা বাধা প্রদান করে পথের ন্যায় গমন করেছেন। নদীগণের মধ্যে শুদ্ধা গিরি অবধি সমুদ্র পর্যন্ত গমনশালী একা সরস্বতী অবগত হয়েছিলেন।

বৃহদু গারিষে বচোহসূর্যা নদীনম্ ।
সরস্বতী মিণহয়া সুবৃক্তিভিঃ স্তোমৈর্ব সিষ্ট রোদসী॥ ১
উভে যরে মহিনা শুভ্রে অন্ধাসী অধিক্ষিয়ন্তি পুরবঃ।
সানো বোধবিত্রী মরুৎসখা চোদ রাধো মযোনাম্॥২ (ঋগ্বেদ ৭/৯৬/১-২)

অনুবাদঃ
হে বশিষ্ঠ! তুমি নদীগণের মধ্যে বলবতী সরস্বতীর উদ্দেশ্যে বৃহৎ স্তোত্রগান রচনা কর, দ্যাবা পৃথিবীতে বর্তমানা সরস্বতী! তোমার মহিমা দ্বারা মনুষ্যগণ উভয়বিধ অন্ন প্রাপ্ত হয়। তুমি রক্ষাকারিণী হয়ে হয়ে আমাদের অবগত হও, মরুৎগণের সখা হয়ে হবিষ্মানদের নিকট ধন প্রেরণ কর।

বৈদিক যুগে সরস্বতী নদীর তীরে মনোরম প্রাকৃতিক নতুন পরিবেশে, কল্লোলিনীর উচ্ছল জল তরঙ্গে শ্বেত শুভ্র রাজহংসের আনাগোনায়, সামগানের সুমধুর সুরে ভাবুক ঋষিমনে জ্ঞানদায়িনী সরস্বতী মাতার আবির্ভাব হয়। তিনি বাগদেবী বেদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। নিরুক্তকার যাস্ক বলেছেন, ‘তত্র সরস্বতী ইতি এতস্য নদী বদ্বোবচ্চ নিগমা মূল ঋগ্বেদে সরস্বতীর উভয় প্রকার গুণ লক্ষিত হয়। পুরাকালে সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞ সম্পাদন হত এবং ক্রমে সে সরস্বতী নদী সে পবিত্র মন্ত্রের দেবী ও বাগদেবী বলে পরিণত হলেন। বেদে সরস্বতী শুধু বিদ্যাদায়িনী বা জ্ঞানদায়িনী নয় তিনি অশুভ শক্তি ধ্বংসকারী।

সরস্বতী দেবনিদো নি বর্হয় প্রজাং বিশ্বাস্য বৃসয়স্য মায়িনঃ।
উত ক্ষিতিভ্যোহবনীরবিন্দো বিষমেভ্যো অস্রবো বাজিনীবতি॥ (ঋগ্বেদ ৬/৬১/৩)

আনুবাদঃ
হে সরস্বতী তুমি দেবনিন্দকগণকে বধ করেছ এবং সর্বব্যাপী মায়াবী কৃসয়ের পুত্রকে সংহার করেছ। হে অন্নসম্পনা দেবী! তুমি মানবগণকে ভূমি প্রদান করেছ এবং তাদের জন্য বারিবর্ষণ করেছ। মাতা সরস্বতী আমাদের অশুভশক্তি বিনাশে শক্তি দিয়ে থাকেন।

যস্ত্বা দেবী সরস্বতুৎপব্রুতে ধনে হিতো ইন্দ্রংন বৃত্রতূর্যে। (ঋগ্বেদ ৬/৬১/৫)

অনুবাদঃ হে দেবী সরস্বতী যে ব্যক্তি তোমাকে ইন্দ্রের ন্যায় স্তব করেন সে ব্যক্তি যখন ধনলাভার্থে যুদ্ধ করেন তখন তাকে তুমি রক্ষা কর।

দেবী সরস্বতী শুচি শুভ্র, শ্বেত অঙ্গকান্তি, শ্বেতপদ্মাসীনা এবং শ্বেত হংসবাহনা। তার কৃপায় মানুষের জাগতিক এবং পারমার্থিক জ্ঞান লাভ হয়। তিনি সঙ্গীতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সঙ্গীত ও রাগের সমন্বয়ে ‘ওঁ কার ও গায়ত্রী মন্ত্র শুদ্ধাচারে উচ্চারণে জীবাত্মা পরমাত্মায় লয় হয়। উপনিষদে বলা হয়েছে-

বিদ্যাং চাবিদ্যাং চ যস্তদ্ বেদোভয়্সঁহ।
অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীত্বা বিদ্যায়াহমৃতমশ্নূতে॥ (ঈশ উপনিষদ/১১)

অনুবাদঃ
যে মানুষ সেই উভয়কে অর্থাৎ জ্ঞানের তত্ত্বকে ও কর্মের তত্ত্বকে ও একসঙ্গে যথার্থ রূপে জানতে পারে। সে কর্মসমুহ অনুষ্ঠানে মৃত্যুকে অতিক্রম করে আর জ্ঞানের অনুষ্ঠানে অমৃতকে উপভোগ করে অর্থাৎ আনন্দময় অমৃত লাভ করে। মার কৃপাতে আমরা উভয়বিধ জ্ঞানই পেয়ে থাকি। উপরের বর্ণনায় এটা প্রমাণিত যে দেবী সরস্বতী বেদের যুগ থেকেই পূজতিা।

কোন মন্তব্য নেই: